পুজোর বাঁশ – সৈকত সেনগুপ্ত

চক্রবর্তী-দের বাড়ির ছাদে যে একটা ভাঙা টেবিল পড়ে আছে, সেটা এতদিন লক্ষ্যই করেনি রাজা। কি করে এমন একটা জিনিস নজর এড়িয়ে গেল তার? কমদিন হলো না এই পাড়ায় আসা। আর এখানে আসা ইস্তক বারান্দায় দাঁড়িয়ে চারপাশ-টা তারিয়ে তারিয়ে দেখা হলো তার সব থেকে পছন্দের কাজ। নতুন পরিবেশের সঙ্গে বন্ধুত্ব পাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা আর কি। কোন গাছের ডালে কাকগুলো বাসা বাঁধছে, কোন বাড়ির উঠোনে কল-ঘেঁষে একটা কলাগাছ বেড়ে উঠেছে, পুকুর পাড়ের মন্দিরে ঠিক কখন সন্ধে নামে – এসব কিছুই তার জানা। তবু, চক্রবর্তী-দের বাড়ির ছাদের ওই কালো স্যাঁতস্যাঁতে টেবিল-টা তার চোখ এড়িয়ে গেছে।

গত কয়েকদিন অঝোর বৃষ্টির পরে আজ রোদ উঠতেই চারপাশ-টা কেমন শরত-শরত। গাছের পাতাগুলো ঝক ঝক করছে। আশপাশের বাড়িগুলোর জল-বসা চেহারা পাল্টে গিয়ে সব-ই খুব নতুন নতুন  লাগছে। তাই বোধহয় ওই পুরনো টেবিল-টা এত চোখে পড়ছে আজ।

পুরনো জিনিসপত্র ঘাঁটাঘাঁটি করতে বেশ লাগে রাজা-র। পুরনো বাড়ি, পুরনো ঘর-দোর, পুরনো আসবাব, পুরনো বইপত্র – এসব কিছুই কেমন আপন করে নেই রাজা- কে।কতদিনের কত কথা, সুখ দুঃখ, হাসি কান্না যেন মাখামাখি হয়ে ঘন হয়ে রয়েছে। ওই টেবিল-টা যদি আগে দেখতে পেত রাজা, তাহলে এতদিনে ওটাকে ঘিরে বিস্তর কল্পনার জাল বুনে ফেলতে পারত। এই আফসোস-টা কিছুতেই ভুলতে পারছে না সে।

আজ রবিবার নয়, তবু রাজা আজ বাড়িতে। অফিস না গিয়ে বাড়ি বসে থাকা-টা মোটেই পছন্দ করে না অনিন্দিতা। ছোটখাটো দাম্পত্য কলহ ছাড়া রাজা আর অনন্দিতা-র মধ্যে তেমন কোনো মতবিরোধ কখনো হয়নি। কিন্ত রাজা-র এই হঠাত হঠাত চুপ করে যাওয়া আর বাইরের দিকে তাকিয়ে থাকা-টা একদম সহ্য করতে পারে না অনন্দিতা। আজকাল এটা যেন বড্ড বাড়িয়ে তুলেছে রাজা।

“মাধবীর মা-কে এবার পুজোয় একটু বেশি টাকা দিতে হবে।” অনিন্দিতার কথায় চমকে ওঠে রাজা। পুজো যদিও এবছর তাড়াতাড়ি, তবু এখনও এক মাসের ওপর সময় আছে হাতে। অনিন্দিতা যে কি করে, এরই মধ্যে খরচ করতে শুরু করে দিয়েছে বোধ হয়। নতুন বাড়ি ভাড়া নেওয়ার সময় জমানো টাকার অনেকটাই খরচ হয়ে গেছে। তার ওপর ভোম্বল-কে নতুন স্খুল-এ ভর্তি করতে হয়েছে। হাত প্রায় কিছুই নেই।

“এবার পুজোর পর কোথাও বেড়াতে যাচ্ছি না বলে জামাকাপড়-ও কিনব না, এটা ভেবো না।” উফফ, অনন্দিতার কি কোনো কাজ নেই? সকাল থেকে খিটির মিটির শুরু করেছে। “আমি কি কিনতে বারণ করেছি?” একটু রেগেই উত্তর দেয় রাজা। অনিন্দিতাও তেড়ে ওঠে, “মেজাজ দেখিও না, সারাদিন খেটে খেটে মরি, বছরে একবার বেড়াতে যাওয়া, সেটাও এবার হলো না। একটু শপিং করব বলছি, তাতেও আপত্তি?” কি থেকে কি। হই চই ভালো লাগে না রাজার। সকাল থেকে পাড়াতেও হই চই হচ্ছে – কে জানে কেন? হই চই হলে ভাবতে খুব অসুবিধে হয়। আচ্ছা হই চই কি ছোঁয়াচে? একটু আগে পাড়ায় হচ্ছিল, এখন বাড়িতে। ভোম্বল দেখতে গিয়েছিল না কি হচ্ছে পাড়ায়? এখনও ফিরল না তো? এদিকে স্কুলের দেরি হয়ে যাচ্ছে।

“বিয়ে বাড়ি পরে যাওয়ার মত ভালো শাড়ি, জুতো নেই আমার। গয়না তো ছেড়েই দাও। অঘ্রাণে পম্পির বিয়ে, এখন থেকেই কেনাকাটা সেরে রাখব। আমার-টা, আর পম্পির গিফট-ও।” অনিন্দিতা বলেই চলে। “মাধবীর মা-কে একটু বেশি দেব, সুবিধে অসুবিধে ও কম করে না। সেই কবে থেকে আমাদের বাড়িতে কাজ করছে, এত দুরে এই বাড়িতেও আসে, আমাদের ভালবাসে বলেই না? মা-বাবা যদি পুজোয় আসেন তাহলে ওনাদের-টাও কিনে রাখব  এখুনি, এর পরে আবার ভিড় শুরু হয়ে যাবে।”

ডোর বেল বাজলো। অনিন্দিতা দেখতে গেছে। একটু রেহাই পাওয়া গেছে। কাঁচা সোনা রোদ-টা প্রাণ-ভ’রে দেখার চেষ্টা করে রাজা। “শুনছ, তোমায় কারা ডাকছে।” অনিন্দিতার কথায় চমকে ওঠে রাজা। এখন আবার কে ডাকতে এলো? তারা এই পাড়ায় নতুন এসেছে, আর যাদের স্বভাব কম কথা বলা, তাদের সামাজিক গন্ডি-টাও সাধারণত ছোটই হয়। খবরে কাগজ-ওলা আর দু-এক জন দোকানদার ছাড়া, রাজা-কে বিশেষ কেউ চেনে না। বাড়ি ভাড়াও দেওয়া হয়ে গিয়েছে। আকাশ পাতাল ভাবতে ভাবতে দরজার দিকে এগোয় রাজা। বেশ কিছু অপরিচিত মুখ। একজন পাকা গোছের লোক বলে ওঠে “পুজোর চাঁদা-টা।” এটা অপ্রত্যাশিত নয়। পুরনো পাড়াতেও পুজোর চাঁদা দিতে হত। “কত?” খানিকটা স্বগতোক্তির মতই বলে ফেলে রাজা। “আপনারা নতুন এলেন, এখানে এসে আমাদের একদিন আমাদের খাওয়ালেনও না। সে যাই হোক, হাজার দু-এক ধরে রাখুন। এক্ষুনি দিতে হবে না, ক’দিন পরে আসব না হয়?”

অনিন্দিতা পেছনে দাঁড়িয়ে শুনছিল, “দু’হাজার? তুমি কিছু বললে না? হাঁ ক’রে শুনলে?” রাজা মনে মনে জমা খরচের হিসেব কষতে থাকে, মাধবীর মা-র অন্তত হাজার, পাড়ার পুজোর চাঁদা দু’হাজার, শপিং বারো ছাড়াবেই – এ দিকে এবার বোনাস হবে না, জমানো টাকা নেই-ই  প্রায়।

দুদ্দাড় ক’রে ঘরে ঢুকলো ভোম্বল। “ক্যামেরা কই? ক্যামেরা কই? ফেসবুকে ছবি দিতে হবে।” চিত্কার করছে। “কি হয়েছে কি? কোথায় ছিলিস এতক্ষণ? পাড়ায় এত গোলমাল কিসের?” রাজা-কে প্রায় তোয়াক্কা না ক’রে দৌড়ে বেরিয়ে গেল ভোম্বল, হাতে ক্যামেরা। চেঁচিয়ে বলল. “পুজোর বাঁশ এসেছে বাবা – পুজোর বাঁশ।”

Leave a Comment